• শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৪ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
নীলফামারীতে তিন দিনের ইজতেমা শুরু ভোটের দিনে লিফলেট বিতরণের দায়ে জামায়াত নেতার অর্থদন্ড নীলসাগর ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত, ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগ বন্ধ বিশ্ব স্ট্রোক দিবস: স্ট্রোকের ঝুঁকি, রিহ্যাবের সংকট ও পুনর্বাসনে সচেতনতার আহ্বান তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার হত্যা মামলায় মাগুরার সাবেক ওসি ও এসআই জেলহাজতে ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে ৯ কর্মকর্তা প্রত্যাহার সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় জলঢাকা পৌরসভার সাবেক মেয়র গ্রেপ্তার রানীরবন্দরে বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী ব্যবসায়ী নিহত “ভালো থেকো আমার না হওয়া মহারানী”

ঝিনাইদহের হাসিনা পাগলীর চোখে মুক্তিযোদ্ধা

জাহিদুর রহমান তারিক, ঝিনাইদহ: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথা তুলতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন পাগলী। হাসিনা পাগলী। এ নামেই পরিচিত সবার কাছে। সেই যুদ্ধের সময় থেকেই। পাগলী হলেও অনেক মুক্তিযোদ্ধার প্রাণ বাঁচিয়েছেন নানান  কৌশলে। অনেক সময় পাকসেনাদের আসার খবর জানিয়ে। অনেকসময় নিজের নিরাপত্তা ও  সম্ভ্রমের কথা না ভেবে।
ঝিনাইদহের মহেশপুরের যাদবপুর যুদ্ধে অংশে নেওয়া মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমান বাজারের মধ্যে থেকে ধরে নিয়ে এলেন পাগলীকে। বসালেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড অফিসের বারান্দায়। বাজার সংলগ্ন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের ক্যাম্পের সামনেই তার নিত্য আবাস। ঠিক পাশেই বেতনা নদী, যেখানে সংগঠিত হয়েছিল যাদবপুরের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। হাসিনা এ জায়গাটাতে থাকতেই পছন্দ করেন ৪৫ বছর ধরে।
পারিবারিক নানান কারণে যুদ্ধের আগ থেকেই হাসিনা ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন। কাজে-কথায় সংগতি না থাকায় যাদবপুর বাজারের লোকজন তাকে পাগলী নামেই ডাকে। কমবেশি তাদেরই সাহায্য সহযোগিতায় বেঁচে আছেন পাগলী। সম্প্রতি তার জন্য বয়স্কভাতার ব্যবস্থা করেছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা।
পাগলীর হুঁশ না থাকলেও দেশের স্বাধীনতার কথা হয়তো তিনি বুঝতেন। না হলে কেনই বা  মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচাবেন! এখনও তিনি যাদবপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে শ্রদ্ধার পাত্রী। অনেকবার তাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি উঠলেও বিভিন্ন কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি।
জিজ্ঞেস করতেই মুক্তিযুদ্ধের কথা, সায়েদকে বাঁচানোর চেষ্টার কথা অকপটে বলে কাঁদতে লাগলেন অঝোরে। উগরে দিলেন একরাশ কষ্ট। যুদ্ধের দিন ছিল মঙ্গলবার। ২২ সেপ্টেম্বর, নদীতীরবর্তী গ্রাম যাদবপুর। দক্ষিণে তিন কিলোমিটারের মতো এগোলেই ভারতের সীমান্তবর্তী গ্রাম মধুপুর। এপারে গোপালপুর। পুবে ধান্যবাড়িয়া। মহেশপুর দিয়ে সর্পিল গতিতে এঁকেবেঁকে ভারতের বনগাঁয় ঢুকেছে বেতনা। যুদ্ধ হয় বেতনার দু’পারেই।
সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে যুদ্ধ। পাকিস্তানিদের চারদিক দিয়ে আক্রমণে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয় মুক্তিবাহিনী। বেতনা নদীতীরের সেই দীর্ঘ যুদ্ধে প্রাণে বাঁচতে কচুরিপানা ভরা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযোদ্ধা মো. সায়েদ আলী। মাথায় পরা ছিলো হেলমেট। হাতে ছিল এলএমজি। এলএমজিটি আগে ফেলে দেন পানিতে। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়েন নিজে। কিন্তু রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা বিষয়টি বুঝতে পারে।
খোঁজ করতে থাকে সায়েদ আলীর। একপর্যায়ে তারা সিদ্ধান্ত নেয় পাগলী হাসিনাকে পানিতে নামিয়ে খোঁজার। কারণ ওই এলাকায় সবসময় পাওয়া যেত তাকে। পাগলীকে পানিতে নামিয়ে কেউ আছে কিনা খুঁজতে বলে। হাঁটুপানিতে নেমেই হাতড়ে সায়েদ আলীর মাথার ছোঁয়া পান পাগলী। তাৎক্ষণিক পাগলী তার পরনের সাদা ধুতির মতো শাড়ির নিচে লুকিয়ে ফেলেন সায়েদকে। বলেন, ‘এখানে কেউ নেই। তোমরা চলে যাও।’
কিন্তু পানির নড়চড়া দেখে সন্দেহ হয় রাজাকারদের। কিন্তু হাসিনা তাদের বোঝাতে থাকেন এখানে কেউ নেই। রাজাকাররা একটু সরে গেলে হাসিনাও উঠে পড়েন পানি থেকে। তখন সায়েদ ডুব দিয়ে দূরে সরে যাচ্ছিলেন।
এমন সময় রাজাকাররা আবার উঁকি দিয়ে দেখতে পায় সায়েদকে। গুলি করতে উদ্যত হলে সায়েদ হাত উঁচিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় তিনমাস। পরে ডিসেম্বরের প্রথম দিকে মিত্রবাহিনী যখন বিমান হামলা শুরু করে তখন কারাগারে আটক অন্যদের মতো সায়েদও কারাগার ভেঙে মুক্ত হন।
পাগলী হাসিনা যেভাবে শাড়ির নিচে লুকিয়ে সায়েদকে প্রাণে বাঁচিয়ে দিলেন তা অনেকটা নোবেল সাহিত্য পুরস্কারজয়ী জার্মান ঔপন্যাসিক গ্যুন্টার গ্রাসের ধ্রুপদী উপন্যাস ‘টিন ড্রাম’ কাহিনির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে গ্রাস নাৎসীদের তাড়া খাওয়া এক বিপন্ন ইহুদির কথা বলেছেন। যে মাঠের উপর দিয়ে পালাচ্ছিল। এসময় মাঠে একা একা আলু পুড়ে খাচ্ছিল এক পাগলী। সেও বুদ্ধি করে নিজের লম্বা গাউনের নিচে আশ্রয় দিয়ে ইহুদিকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। ইহুদিটা পালিয়ে গেছে মনে করে ফিরে গিয়েছিল নাৎসী সেনারা।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই হাসিনা পাগলীকে নিয়মিত সাহায্য সহযোগিতা করেন বর্তমানে কুয়েত প্রবাসী সায়েদ আলী। পাগলী তাকে দেখলে বলেন, ‘তুই আমার ছেলে নাহ!’একই যুদ্ধে পায়ে গুলি লেগে আহত হওয়া খলিলুর রহমান, মো. আব্দুর রহমানও জানেন সেদিনের ঘটনা। পাগলীকে তাই শ্রদ্ধা করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্যমতে, পাগলী ওইসময় নিয়মিত এ এলাকায় ঘুরে বেড়াতো। সবসময় থাকতো পথে ঘাটে। কখনও খবর দিতো পাকিস্তানিরা আসছে বলে। আর গুলির খোসা কুড়ানো ছিল তার কাজ। ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করতেন। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার, যুদ্ধের সময় এতো গোলাগুলি তার আশপাশ দিয়ে চলে গেছে, তবু সেসব তার গা ভেদ করেনি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ